Post170805.1-Big

নব্বইয়ের দশকের বাচ্চাদের ভাগ্যবান বলে মনে করেন বোদ্ধাদের কেউ কেউ, সেটা অনেক কিছু বিবেচনা করেই। আসলেই মনে হয় তাই। তারা যেসব জিনিস দেখেছে, খেয়েছে বা অভিজ্ঞতা করেছে, পরবর্তী বা পূর্ববর্তী কোন বাচ্চারা তা হয়তো পায়নি। এই নব্বইয়ের দশকে যারা বাচ্চা ছিলো, তাদের ছোটবেলার কোন স্মৃতি রোমন্থন করতে বললে, সে গল্পের কোনো না কোনো ফাঁকে দিয়ে হয়তো উঁকি দেবে ‘সংশপ্তক’ কিংবা ‘কোথাও কেউ নেই’ অথবা অন্য কোন নাটকের কাহিনী বা নাটক দেখতে দেখতে মজার কোন ঘটনা। হ্যাঁ, ওই সময়ে নাটক মানুষের জীবনের সাথে এতটাই জড়িয়ে ছিল। এটা হওয়ারই ছিল। সবার ঘরে ঘরে তো আর টিভি ছিল না, পাড়াÑ প্রতিবেশী সবাই মিলে একসাথে বসে টিভি দেখতো যার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এই নাটক। চ্যানেল ছিল একটা, নাটকও দু-একটা। সেই কয়েকটা নাটক দেখেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ঘুমুতে যেতে দেখতাম মা খালাদের।

উপরে যা বলা হলো, সবই আবেগের কথা। এখন আসি বাস্তবতায়। ৬/৭ বছর আগেও ‘নাটক আর আগের মতো নেই’ এই কথা বলবো কি বলবো না এমন একটা সংশয় কাজ করতো। কিন্তু গত ক’বছরের নাটকের করুণ দশা দেখে এ কথা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় যে, বাংলাদেশের নাটক, আসলেই করুণতম অবস্থায় আছে। নাটক নিয়ে যে কোন সমালোচনামূলক লেখায় উপরের আবেগী বিষয়গুলো তাই আসেই। আহাÑআগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম। বর্তমান নির্মাতাদেরও এই নব্বইয়ের দশকের নাটকের গুণকীর্তন শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। কান ঝালাপালা হোক আর যাই হোক, সত্যটা মেনে নিতে হবে। ২০১০ পর্যন্ত বেশ কিছু ভালো নাটক হয়েছে, নাটক আছে যার কথা একজন আরেকজনকে বলেছে? ক’টা নাটকের ডায়লগ মানুষ মুখে মুখে আওড়েছে?

একটু শুরু থেকে আসি। ১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে মুনীর চৌধুরী রচিত ও মনিরুল আলম পরিচালিত নাটক ‘একতলা দোতলা’ প্রচারিত হয়। এটা মূলত মঞ্চ নাটকই, সরাসরি সম্প্রচার করে দেখানো হয়েছিল। তখন তো এডিটের সুবিধা ছিল না, তাই মঞ্চকেই সেট সাজিয়ে শ্যুটিং করা হতো। আউটডোর শ্যুটিং সম্ভব ছিলো না। পরবর্তীতে অবশ্য এডিটের সুবিধা আসার পরেও ইনডোরেই অনেক নাটকের শ্যুটিং হয়েছে। আশির দশকের কথা, তখন টেলিভিশন সেট মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ পারিবারিক বিনোদনের কথা মাথায় রেখে নির্মিত হতে থাকে টিভি নাটক। বিভিন্ন উপন্যাসের কাহিনী, মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী, সংগ্রামী চরিত্র, নাগরিক জীবন, এ-ই ছিল এসব নাটকের বিষয়। খুব দ্রুতই বিখ্যাত হতে থাকে নাটকগুলো। ধারাবাহিক, সাপ্তাহিক ও বিশেষ দিবসে বিশেষ নাটক তো ছিলোই। ‘সময় অসময়’, ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘সংশপ্তক’র মতো ধারাবাহিক নাটক এবং ‘এখানে নোঙর’,  ‘শাহজাদীর কালো নেকাব’, ‘রক্তকরবী’, ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’, ‘বাবার কলম কোথায়’ ও ‘ক্ষুধিত পাষাণ’র মতো সাপ্তাহিক নাটকগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের ‘জব্বার আলী’ সিরিজের নাটক ছিলো প্রতি ঈদের দিনের মানুষের আকর্ষণ, ১৯৭৪ সাল থেকে যা টিভিতে প্রচার হয়ে আসছিলো। তবে বাংলা নাটকে হুমায়ুন আহমেদের আবির্ভাব যেন বড় ধরণের একটা বিপ্লবই ঘটিয়েছে। আশি থেকে নব্বইয়ের দশকে তাঁর ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহী’ সবগুলো নাটক দর্শক জনপ্রিয়তা পায়। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটক চলাকালীন হুমায়ুন আহমেদের বাসার সামনে ক্ষুব্ধ জনতার ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’ শ্লোগানের কথা তো কারো কাছে অজানা নেই।

নাটক যে তখন কি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় ছিল তা একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলার শুধুমাত্র নাটকগুলো শুরু থেকে ততো একটা দর্শক জনপ্রিয়তা না পাওয়ায় এই চ্যানেলটিই তখন ধোপে টিকতে পারেনি। কিন্তু ২০০০ সালে একুশে টিভি যখন ঝা তকতকে প্রিন্টে ভালো ভালো সব নাটক দেখানো শুরু করলো, সবার পছন্দের চ্যানেলের তালিকায় চলে আসলো এই একুশে টিভি। ইতোমধ্যে চ্যানেল আই, এনটিভি নামে আরো দুটি নতুন চ্যানেল চালু হয়। চ্যানেল বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে দর্শক, সেই সাথে সমানতালে নাটক। ২০১০ সালের আগ পর্যন্তও ভালো কিছু নাটক নির্মিত হয়েছে। ‘বন্ধন’, ‘বিপ্রতীপ’, ‘জনক-জননী’, ‘নাল পিরান’, ‘রমিজের আয়না’, ‘চিঠি’, ‘লাবন্যপ্রভা’সহ বেশ কিছু নাটক বেশ জনপ্রিয় হয়। আর এই সময়ে দর্শকদের অন্যতম আকর্ষণ ছিলো হুমায়ুন আহমেদের নাটক। ঈদসহ অন্যান্য সময়ে তার ‘কালা কইতর’, ‘এই বরষায়’, ‘উড়ে যায় বকপক্ষী, ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’, ‘চন্দ্রগ্রহণ’, ‘বৃহন্নলা’, ‘বাদলা দিনের গান’, ‘চন্দ্র কারিগর’ ছিল তার নন্দিত নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই সময়ে ঈদ ছিল নাটকের জন্য অন্যরকম একটা সময়। চ্যানেলগুলো সেরা সেরা সব নাটক জমিয়ে রাখতো ঈদে প্রচার করবে বলে। ঈদের ছুটিতে পরিবারের সবাই একসাথে বসে নাটকগুলো উপভোগ করতো। জীবন তখনো খুব একটা খারাপ ছিলো না।

‘আগের মতো নেই’, এই আক্ষেপের ভিত্তি প্রস্থর স্থাপিত হয়েছিল কিন্তু ২০০৭-০৮ এর সময় থেকেই। কারণ খুঁজতে গেলে বেশ কিছু কারণই আসবে। প্রথমত বলা যেতে পারে – অনুকরণ। এটা সর্বনাশী! এই ব্যাপারটা এমন যে, কোনো একটা ভালো নাটক নির্মাণ করা হলো, এখন এই নাটকের উপাদানগুলো ঠিক রেখে, কাহিনী একটু পরিবর্তন করে অন্য নির্মাতাররা বেশ কিছু নাটক নির্মাণ করে। ধরা যাক, হুমায়ুন আহমেদের কথাই। নিতান্ত বিনোদনের উদ্দেশ্যেই তিনি কিছু নাটক নির্মাণ করেছেন। এসব নাটকে চরিত্র খুব বেশী একটা থাকে না, থাকলেও নির্দিষ্ট ঘটনা কিংবা একটি এলাকা ঘিরেই নাটকের কাহিনী আবর্তিত হয়। মজার মজার ডায়লগ থাকে, দর্শক হেসে কুটি কুটি হয়। ‘তারা তিনজন’, ‘সমুদ্র বিলাস প্রাইভেট লিমিটেড’, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন’, ‘নুরুদ্দীন স্বর্ণপদক’, ‘ওয়াং পি’ প্রভৃতি নাটকগুলো দর্শক জনপ্রিয় হয়। সমস্যা তখনই শুরু হলো যখন এই নাটকের থীম কিংবা চরিত্রের ধরণ, একই ধরণের ডায়লগ এবং উপকরণ ব্যবহার করে অন্য আরো অনেক নির্মাতা নাটক বানানো শুরু করেন। রান্না তো আর উপকরণের উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে রাঁধুনির উপর। ফলাফল যা হবার, তাই। ভয়াবহ ব্যর্থ হলো নাটকগুলো। এই অনুকরণের সমস্যাটা তখন, এখন সবসময় ধরে চলে আসছে। এটা মহামারী এই কারণে যে, একটা ভালো নাটকের অনুকরণে আরো ৫০ টা বাজে নাটক তৈরী হচ্ছে। ফলে দর্শক ভালো কিছুর আশায় দেখতে যেয়ে বারে বারে ব্যর্থ হয়ে এই ধরণের নাটক থেকেই মুখ ফিরিয়ে ফেলে। নির্মাতা সালাউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় ‘রঙের মানুষ’,‘ভবের হাট’ নামে দু’টি নাটক বেশ জনপ্রিয় হয়। সম্পূর্ণ গ্রামীণ পরিবেশে, আঞ্চলিক ভাষায় ছিল নাটকগুলো। এর পর থেকে এই থীমে না হলেও কয়েকশো আঞ্চলিক নাটক হয়েছে। আঞ্চলিক নাটক-সাধারণ দর্শকদের জন্য এ যেন এক বিষফোঁড়া। ছোট একটা কমেডি কাহিনী, ছোট শ্যুটিং স্পট, ছোট একটা টীম – এখন এই নাটক হিট করাতে কি করতে হবে? আঞ্চলিক ভাষা ঢুকিয়ে দাও। বর্তমানে এভাবেই চালাচ্ছেন বেশ কিছু পরিচালক।

দর্শক নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে আসতে পারে অধিক মাত্রার বিজ্ঞাপন ও নাটকের বাজেট কমে যাওয়া। এ দু’টি একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত। নির্মাতারা অভিযোগ করেন যে, তারা নাটক বানানোর জন্যে চ্যানেলগুলো থেকে যথেষ্ট বাজেট পান না। আবার দর্শকের অভিযোগ, নাটকের মাঝে এত এত বিজ্ঞাপন, নাটক দেখার মজাটাই নষ্ট করে দেয়। কারণে আসি। বাংলাদেশে যে হারে টিভি চ্যানেল ও চ্যানেলের অনুষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, সে হারে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে কই? প্রত্যেক বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের সর্বমোট বিজ্ঞাপনের বাজেট তো নির্দিষ্ট। সেই নির্দিষ্ট বাজেটটা সবাই ধরতেই নিজেদের বিজ্ঞাপনের দাম কমিয়ে দিচ্ছেন। যার ফলে একটা নাটকের বাজেট পূরণ করতে বেশী বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন হচ্ছে।  বাজেট কম, ভালো নাটক হচ্ছে না, যা ও হচ্ছে, বিজ্ঞাপনের জ্বালায় দর্শকেরা উপভোগ করতে পারছে না।

osmo-ad

নাটক মুখ থুবড়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে আসতে পারে বিশেষ দর্শকের জন্য নাটক নির্মাণ। ২০০৫ এর কিছু সময় পর থেকে বিশেষত তরুণদের জন্যে উপভোগ্য করে বেশ কিছু নাটক নির্মিত হতে থাকে। নাটকগুলোর চরিত্রায়ন, কাহিনী ছিল সম্পূর্ণ তারুণ্যনির্ভর আর ডায়লগ ছিল কথ্য ভাষা মানে আমজনতার ভাষা। নাটকগুলো তরুণদের মাঝে খুব জনপ্রিয়তা পায়। একের পর এক তরুণদের জন্য ধারাবাহিক নাটক, মেগাসিরিয়াল তৈরী হতে থাকে। অধিকাংশ নাটকই তরুণদের মাঝে হিট। চ্যানেল আরো বাড়ছে বেশ কিছু, প্রয়োজন অনেক নাটক। পরিচালকদের সহকারী পরিচালকেরাও নাটক নির্মাণ করা শুরু করলো। দেখাদেখি আরো অনেকেই একই পন্থা অনুসরণ করলো। চ্যানেলগুলোও কম টাকায় নাটকগুলো কিনে প্রচার করতে লাগলো। নির্মাতারা খুশি, চ্যানেল মালিকেরা খুশি, তরুণ দর্শকেরাও খুশি। এ যেন এক বিপ্লব।

কিন্তু না, বিপ্লব বলা যেতে পারতো যদি না সবার অবচেতন মনে আরেকটা ব্যাপার না ঘটে যেতো। এভাবে শুধুমাত্র তরুণদের জন্য নাটক নির্মাণের ফলে পরিবারের অন্য যারা বায়োজোষ্ঠ্য আছেন, তারা বাংলা টিভি নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পরিবারের মা-খালারা ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের মাঝে নিজেদের আনন্দের বস্তুটা খুঁজে পেলেন। ফলাফল এমন দাঁড়ালো যে, পরিবারের তরুণেরা দেখছে তাদের জন্যে নির্মিত বাংলা নাটক আর অন্যরা ভারতীয় টিভি সিরিয়াল। নাহ, বিপদ এটুকুতে শেষ হলেও পারতো। সবে শুরু। ২০১০ এর দিকের সময়ের কথা। ফেসবুক, ইউটিউব বাংলাদেশে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে। তরুণেরা টিভি থেকে মুখ ফিরিয়ে সবাই আগ্রহী সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে। এখন? ঘরের অন্যরা তো আগে থেকেই বাংলা নাটক দেখছেন না, এখন তরুণেরা টিভিই দেখছে না। এদিকে চ্যানেল বৃদ্ধি কিন্তু থেমে নেই। এত চ্যানেল, দর্শক কই? কিংবা নাটকই বা কই? চ্যানেলগুলো সামনে যা পাচ্ছে, তা-ই চালাচ্ছে।

শুরু হলো বাংলা নাটকের চুড়ান্ত দুর্দশার দিন। দর্শকবিহীন চ্যানেলে চলতে লাগলো আঞ্চলিক নাটক নামের ভাঁড়ামো! যা-ও কিছু দর্শক নাটক দেখতো, অতিরিক্ত বিজ্ঞাপনের জ্বালায় তারাও তা বন্ধ করে দিয়েছে। এই আকালের মাঝে এক দুইটা নাটক যদিওবা ভালো হয়, অমনি শুরু তার সিক্যুয়েল নির্মাণ। সিক্যুয়েল যত বাড়তে থাকে, কমতে থাকে নাটকের মান। সব নাটকই কমেডি। এক দুইজন অভিনেতার উপর নির্ভর করে চলতে থাকে নাটক। একই রকম নাটক দেখতে দেখতে বিরক্ত দর্শক ঈদেও আর টিভি ছাড়েনা। এর মধ্যে আবার হারানো দর্শক ফিরিয়ে আনতে টিভি চ্যানেলের উদ্ভট নিরীক্ষার শেষ নেই। হারানো মহিলা দর্শকদের ফিরিয়ে আনতে ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের আদলে একই ধরণের কাহিনী, শব্দ, চরিত্র ও ভাব ব্যবহার করে বাংলাদেশেও কিছু চ্যানেল মেগা সিরিয়াল চালু করলো এবং এই সিরিয়ালের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ চিন্তা করে শুধু এই সিরিয়াল নির্ভর কিছু চ্যানেল চালু হলো। ফলাফল করুণ। মুখ থুবড়ে পড়লো নাটকগুলো, সাথে চ্যানেলগুলো।

যাক, মহিলা দর্শকদের তো ফিরিয়ে আনা গেলো না, এবার তরুণদের ফিরিয়ে আনার আরেকটা চেষ্টা করা যাক, ভাবলো চ্যানেলগুলো। নতুন এক ধরণের নাটক শুরু হলো। এটাকে সংক্ষেপে কি নাম দেওয়া যায়, বুঝতে পারছি না। ব্যাখ্যাই করা যাক। এই নাটকে একটা ধনী বাবা থাকবে এবং তার ছেলে থাকবে। আর নাটকের চরিত্র সব তরুণ, তাদের মা বাবা অথবা পরিবার আছে কি না তা নাটকের কোথাও বোঝা যাবে না এবং তরুণদের প্রেম, আড্ডা আর পরোক্ষ যৌনতা – এই হলো নাটক। এই ফর্মুলায় একটা দুটো নাটক হিট হলো বটে কিন্তু ওই যে, অনুকরণ। সব নাটক এই ফর্মূলায় হওয়া শুরু হলো ফলে দিনশেষে, যা, তা-ই। তরুণ দর্শকদের জোর করে ধরে রাখতে যৌনতা বাড়ানো হলো, তাতে আরো নির্দিষ্ট হলো দর্শক।

দর্শক ফিরিয়ে আনার আরেকটি চেষ্টা হিসেবে কিছু চ্যানেল বিদেশী ঐতিহাসিক টিভি সিরিয়াল আমদানি করে বাংলায় ডাবিং করে প্রচার শুরু করলো। কিভাবে কিভাবে যেন এই টোটকা’টা কাজে লেগে গেল। ডাবিং করা বিদেশি সিরিয়ালের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে গেল। আরেকটা ব্যাপার এখানে উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে একই ধরণের ভারতীয় টিভি সিরিয়াল দেখে দেখে কিন্তু মহিলা দর্শকেরাও খানিকটা বিরক্ত। যাই হোক, পরিবারের ছেলে, বুড়ো, মা, বাবা সবাই মিলে ডাবিং করা সিরিয়াল দেখতে লাগলো। বাংলাদেশী নির্মাতারা চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলো যে, বিদেশী সিরিয়াল ডাবিং করে দেখানো যাবে না। চ্যানেলগুলো পাল্টা বললো যে, বাংলাদেশী নির্মাতারা ভালো কিছু না বানালে তারা কি-ই বা করতে পারে? দর্শক যা দেখতে চায়, তারা তা-ই দেখাচ্ছে। নির্মাতাদের আবার সেই আগের অভিযোগ, ভালো নাটকের জন্য ভালো বাজেট পাচ্ছেন না। চলছে এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।

এত সমস্যা, এত বাধা, এত প্রতিকূলতা। এত সব থেকে মুক্তির উপায় কি নেই? কোন আশাই কি নেই? বাংলা নাটক আগের অবস্থায় ফিরবে কি ফিরবে না সেটা কিছু সময় পরেই বোঝা যাবে তবে আশা যে রাখাই যায়, সে বার্তাই দিয়েছে এবারের ঈদুল ফিতরের নাটকগুলো। এবার ঈদে ভালো রকমের কিছু নাটক হয়েছে যা দীর্ঘদীন পর্যন্ত মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। ‘বিকাল বেলার পাখি’, ‘মিঃ জনি’, ‘মার্চ মাসে শ্যুটিং’, ‘ব্যাচ ২৭’, ‘লাল হলুদ নীল বাতি’, ‘বাদাবন’, ‘নিকট অজানা’সহ বেশ কিছু ভালো ভালো নাটক হয়েছে। কিছু ভালো নাটক হয়েছে এই কারণে আশার কথা বলা হচ্ছে না আশার কথা বলা হচ্ছে কারণ এবার বেশ কিছু নির্মাতা সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করেছেন। আশার কথা বলা হচ্ছে কারণ এবার নির্মাতারা নাটকে অনেক বেশী নিরীক্ষা করেছেন, গৎবাধা নিয়মে চালাননি। থ্রিলার, ফ্যামিলি ড্রামা, হরর, রোমান্টিক, কমেডি সব ধরণের নাটকই এবার হয়েছে। সেই গৎবাধা নিয়মে কিছু নাটক হয়নি যে তা না, হয়েছে কিন্তু এত সব ভালো নাটকের ভীড়ে ধোপে টিকতে পারেনি কোনোটিই। সবাই নাটক নিয়ে কথা বলছে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে, একজন আরেকজনকে দেখতে বলছে, নির্মাতা,  চ্যানেল মালিক, কলাকুশলী, দর্শক সবার তো এটাই চাওয়া। এখন কথা হলো, এই দিন আদো ধরে রাখা সম্ভব হবে তো?

নাটকের সুদিন বলি আর যাই বলি, এটাকে ধরে রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। এবার যে অনেক বেশী বেশী এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হয়েছে, এটা ধরে রাখতে হবে। মানুষ একই রকম জিনিস দেখতে দেখতে কিছুটা ক্লান্ত। তারা ভিন্ন কিছু দেখতে চায়, নতুন কিছু দেখতে চায়। নির্মাতাদের একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে যে, টিভি নাটক বানানো হয় টিভিতে দেখানোর জন্যে যা সাধারণত পরিবারের সবাই মিলে একসাথে দেখে। নাটকে এমন কিছু দেখানো উচিত নয় যা পরিবারের সবার সামনে দেখা বিব্রতকর হতে পারে। নাটকে মানুষ তার আশেপাশের গল্প, চাওয়া পাওয়ার গল্প, যে গল্পের সাথে দর্শক নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারবে এমন গল্পই চায়। আরেকটা জিনিস জরুরী, চ্যানেলগুলোর উচিত নাটকগুলো এমনভাবে শ্রেণীবিন্যাস করা যাতে সব শ্রেণীর দর্শকেরা নিজেদের জন্যে কিছু না কিছু জিনিস খুঁজে পায়। তবেই বাড়বে টিভি দেখা, বাড়বে দর্শক, বাড়বে ভালো নাটক, সুস্থ নাটক।

বাংলাদেশের নাটক, বাংলাদেশের ঐতিহ্য। খুব বেশী আগের কথা নয় যখন পাশের দেশের মানুষেরা আমাদের নাটকের সিডি কিনে দেখতো। খুব বেশী আগের কথা কিন্তু না। সম্ভব, প্রয়োজন নাটককে ভালোবাসা, বৃহত্তর স্বার্থের কল্যাণে নিজের স্বার্থ বিসর্জনের জন্য মানসিক ইচ্ছা, প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। ভালো কিছুর সম্ভাবনা এবার দেখা দিয়েছে, এই সম্ভাবনার ভোর সকালে রূপান্তরিত হলেই হলো।

লেখক : আশরাফ আবির, চলচ্চিত্র নির্মাতা | তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া | ছবি : এনটিভি, ইন্টারনেট

Advertisements