শাহরিয়ার নাফিস

‘আয়নাবাজি’-র পর মানুষের মাঝে উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে এমন সিনেমা আর কোথায়? সারা বছর জুড়েই সিনেমাকেন্দ্রিক নানা ঘটনা, আলোচনা, সমালোচনা নিয়ে কথা চললেও গুনগত মান ও গল্পের অভাবে মানুষ ‘সিনেমা’ নিয়েই আসলে খুব মেতে উঠার সুযোগ পাননি। দীপংকর দীপনের ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সেখানে ব্যাতিক্রম। মুক্তির আগে থেকেই জোর প্রচারনা সিনেমাটাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায় এবং মানুষের এর প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে বিশেষ করে বাংলাদেশে থেকে বিদেশী সিনেমা দেখেন এমন দর্শকরা আশা করছিলেন নতুন কিছু। বলবোনা দীপংকর দীপন এর ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সেখানে পুরোই সফল কিন্তু নতুনত্বের বিচারে, নতুন কিছু শুরু করার ব্যপারে অনেকটাই সফল। যেহেতু এই সিনেমা মূলধন উঠিয়ে আরো কয়েক কোটি টাকার ইতোমধ্যে বাজার থেকে তুলে নিতে সক্ষম হয়েছে সুতরাং এর অপ্রাপ্তিগুলো নিয়ে কথা বলাই যায়।

Dhaka Attack Review 3

যেখানে ঢাকার সিনেমায় থ্রিলার ধাঁচের সিনেমা হয় না বললেই চলে সেখানে পুলিশ কে নিয়ে থ্রিলার হওয়াটা অসম্ভব ভাবনা ছিলো আমাদের জন্য। পরিচালক দীপংকর দীপন সেই অসম্ভককে সম্ভব করে দেখিয়েছেন বলে তিনি বাহবা পাবেনই। এবার একটু সিনেমার খুঁটিনাটি বিষয়ে কথা বলি। সিনেমা হলের বাইরের পোস্টারেই লিখা ছিলো কোন কোন পণ্যের সৌজন্যে সিনেমাটা পরিবেশিত হচ্ছে কিন্তু তারপরও সিনেমার মধ্যে, পণ্যের বিজ্ঞাপন করার প্রচেষ্টাটা ভালো লাগে নাই। সিনেমার কলাকুশলী বাছাইয়ে পরিচালক মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন বলতেই হবে। তবে এমন সিনেমায় মাহিয়া মাহির চরিত্র নিয়ে বিস্তর আপত্তি আছে। সমস্ত গল্পের মাঝে শুধু ওই সাংবাদিক চরিত্রকেই বেখাপ্পা বা অমূলক লেগেছে। একটা গল্পের প্রত্যেক চরিত্রগুলোর একেকটা প্রয়োজনীয়তা থাকে, একেকটা আবেদন থাকে, আর সেই বিচারে মাহিয়া মাহির চরিত্রটা আবেদন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ বলা যায়। শুধুমাত্র সিনেমাতে নায়কের বিপরীতে নায়িকা থাকবে এমন ধারনা থেকে শুধুমাত্র গল্পের প্রয়োজনেই বের হয়ে আসা উচিত। সোয়াত এর অফিসার চরিত্রে এবিএম সুমনের উপস্থিতি ছিলো দুর্দান্ত। কেউ বিশ্বাসই করবে না যে সে মডেল। সিনেমা হলের পাশের সীট থেকে অনেককে বলতে শুনলাম “ওই লোকটা আসলেই বাংলাদেশের সোয়াত এর সদস্য”। শতাব্দী ওয়াদুদ এর অভিনয় দক্ষতা অসাধারন। তিনি পানির মত অভিনেতা। সবসময় স্বীয় দক্ষতায় পাত্রের আঁকার ধারন করেন। এখানেও তাঁর চরিত্রে তিনি মানিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। সিনেমার নায়ক হিসেবে, চরিত্রের সাথে পুরোপুরিভাবে মানিয়ে ভালো কাজ করেছেন আরেফীন শুভ। তার ক্যরিয়ারের অন্যতম মাইলফলক ধরা যেতে পারে এই ছবিকে। তবে পর্দায় তার আর মাহির রসায়নে দর্শক হেসেছে, একদমই মানায় নি তাদের। সবশেষে বলতে গেলে অল্প সময়ে ঝলক দেখিয়েছেন সিনেমার ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করা তাসকিন (চরিত্রের নাম জিসান)। তাকে দেখেই মনে হচ্ছিল একে দিয়ে যেকোনো খারাপ কাজ করানো যায়। হাতি-ঘোড়া মারা ডায়লগসর্বস্ব কিংবা ভয়ংকর (!!) দেখতে ভিলেনের ভীরে তাসকিন এক সুবাতাসের নাম। সিনেমায় সব ধরনের আইন শৃংখলা টীমের অংশগ্রহণ এবং তাদের পোষাক ছিলো চোখে পড়বার মতন। কিন্তু তাদের অনেক মুভমেন্ট-ই প্রশ্নবোধক চিহ্নের মুখোমুখি করা যায়। অথচ এই মুভমেন্ট নিয়েই সবচেয়ে বেশী আশা ছিলো পরিচালকের কাছে। বিশেষ করে শেষের দিকে এসে সোয়াতের ‘ভাউ’ খেয়ে ‘ভয়’ পেয়ে যাওয়ার মত ব্যাপারটা অনেক দর্শকই মেনে নেয় নি। সোয়াত এতো দূর্বলও হয় না। এছাড়া

Dhaka attack review 1

ও সিনেমাতে দুটো প্রহসনের চরিত্রের উপস্থিতি হলো ‘নায়ক আলমগীর’ এবং ‘আফজাল হোসেনের’ উপস্থিতি। তাদেরকে সিনেমাতে নিয়ে ঢাকা অ্যটাকের টীমের কাস্টিং লিস্টকে সমৃদ্ধ করা হয়েছে কিন্তু সিনেমাকে না। সেই সাথে মন্ত্রী চরিত্রে ‘হাসান ইমাম’ও অনেক দূর্বল ছিলেন।

সিনেমাটোগ্রাফি বেশ ভালো ছিলো, অনেক নতুনত্ব ছিলো সেখানে। কালার কেমন সেটা বোঝা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এমন দৃশ্য চট্রগ্রামের আলমাস সিনেমা হলে বসে উপভোগ করার সুযোগ হয়নি। কোয়ালিটি বুঝতেও কোয়ালিটি লাগে যা বাংলাদেশের হলগুলোতে নাই। সিনেমার গল্প বলাটা খুব বেশী ভালো ছিলো না কিন্তু দর্শককে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো। অনেক কিছু আনতে গেলে অনেক কিছুই যে আসে না ব্যাপারটা হয়তো খেয়াল ছিলো না পরিচালকের। সিনেমার গানগুলোর মধ্যে অবশ্যই ‘টিকাটুলির মোড়’ এবং শেষের দিকের গানটার সময়োপযোগিতা ছিলো দারুন। বাকিসব অতোটা ভালো লাগেনি।

‘ঢাকা অ্যাটাক’ নিঃসন্দেহে বাংলা সিনেমার একটি নতুন সোপান। ২০১৯-এ এর সিক্যুয়েল আসছে সেই ঘোষণা সিনেমার শেষেই দেওয়া হয়েছে। অপ্রাপ্তিগুলো ঘুচিয়ে, অতিরিক্ত ব্যাপারগুলো বাদ দিয়ে আরো ভালোভাবে আসবে ‘ঢাকা অ্যাটাক’, এই প্রত্যাশায়। এর স্রোতধারায় আরো নতুন ভিন্ন মাত্রার সিনেমা আসবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সীমাবদ্ধতাকে জয় করে সর্বোপরি ‘ঢাকা অ্যাটাক’ নন্দিত সিনেমা হিসেবেই বিবেচিত হবে। ভেঙে যাক সব শৃঙ্খল, জয় হোক বাংলা সিনেমার।

লেখক: অভিনেতা ও কলামিস্ট

Advertisements