তাহমিদা নূর মোস্তফা, চলচ্চিত্র সমালোচক ও গবেষক 

এদেশের নির্বাক চলচ্চিত্রের ইতিহাস ৮৮বছরের এবং সবাক চলচ্চিত্রের ইতিহাস ৫৯বছরের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। ইতিহাসের দীর্ঘ এই পথচলা সত্ত্বেও আমরা চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্কট নিয়ে ভাবিত, চিন্তিত। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আলোচনার যে কোনো প্রসঙ্গে আমরা ‘শিল্প’ শব্দটি যুক্ত করি। কিন্তু চলচ্চিত্র মাধ্যমটি আর্টের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘শিল্প’ না ইন্ডাস্ট্রির প্রতিশব্দ হিসেবে ‘শিল্প’ সে সম্পর্কে ধারণাগত অবস্থান অনেকের কাছেই অস্পষ্ট। দীর্ঘদিনের এই অস্পষ্টতা চলচ্চিত্র শিল্পের সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। স্বাধীনতার ৪৪বছর পরেও এদেশের চলচ্চিত্র আর্ট হিসেবে ‘শিল্প’ না ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ‘শিল্প’ সেই ভাবনা আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দীর্ঘসময়ে আর্টের মর্যাদা যেমন অর্জন করতে পারেনি, তেমনি শিল্পঋণের সুবিধা বঞ্চিত হয়ে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবেও ‘জাতে’ উঠতে পারেনি। সুতরাং প্রতিপাদ্য বিষয়ের পশ্চাতে বহুমাত্রিক নৈরাশ্য ও হতাশাবোধ যেমন আছে, তেমনি আছে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। আমাদের চাই এমন একটি শিল্পরূপ, যার দু‘চারটি কথা-ই কোটি কোটি মানুষের মনের কথা। আমাদের চলচ্চিত্রের কাছে তাই স্বাধীনতার বিশেষ এবং একান্ত চাহিদা সামগ্রিক সত্যের। Untitled-1-12-1

monpura-movie-poster-240x300গণমানুষের জন্য চলচ্চিত্র অবশ্যই শিল্প বা আর্ট এবং একই সাথে চলচ্চিত্র একটা উৎপাদনশীল শিল্প যা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত স্থানেই উৎপাদিত হয়। এবং পরবর্তিতে পণ্য হিসেবে বাজারজাত করা হয়। এজন্য চলচ্চিত্র একটি ইন্ডাস্ট্রি। একটি চলচ্চিত্রের আনুষঙ্গিক অনেককিছুই থাকে- যা চলচ্চিত্রকে পরিপূর্ণ করে তোলে। চলচ্চিত্রের মূল ধারক হচ্ছে এর গল্প বা চিত্রনাট্য। একটা সহজ, বাস্তবিক এবং শিক্ষামূলক গল্প একটা ভাল চলচ্চিত্রের প্রাণ। এছাড়াও থাকে অভিনয়, চিত্রায়ন, সঙ্গীত, প্রেক্ষাপট এবং সম্পাদনা। এই প্রতিটি অনুষঙ্গ যখন একে অপরের উপযুক্ত হয় তখনই সেই চলচ্চিত্রটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে প্রকাশিত হয়। আবার কখনও কখনও দেখা যায় কোন একটা চলচ্চিত্রের গল্প ভাল ছিল কিন্তু চরিত্রায়ন সঠিক না হওয়ায় সেটা ব্যবসা সফল হয়নি। অথবা গল্প ভাল ছিলনা কিন্তু সঙ্গীত মূর্ছনা দিয়ে এটা ব্যবসা সফল হয়েছে বা গণমানুষের কাছে সমাদৃত হয়েছে, আবার চলচ্চিত্রটি শিক্ষামূলক বা ইতিহাস নির্ভর হওয়ায় দর্শকরা ভালভাবে নিয়েছে। আসলে একটা শিল্পের, অন্ততঃ চলচ্চিত্রের মত বিশাল একটা শিল্পের ভাল-মন্দ যাচাই করা খুব সহজ নয়! পৃথিবীতে অসংখ্য চলচ্চিত্র আছে যেগুলি মোটেই ব্যবসাসফল নয়, অথচ ব্যাপক দর্শক-সমাদৃত। আসলে ছায়াছবি বা চলচ্চিত্র’র সাথে ভিজ্যুয়াল বিশ্বের সমন্বয় থাকায় সাধারণ মানুষের সাথে সবচেয়ে ভাল যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। অন্য কোন শিল্পমাধ্যম বাস্তবিকই সাধারণের সাথে এতোটা যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম নয়।

abdul-jabbar-khan

“এদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়”- এরূপ মানসিক প্রতিবন্ধকতা ও সংকটের মধ্য দিয়েই আবদুল জব্বার খান নির্মাণ করেছিলেন সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। ছবিটি ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি লাভ করে। সকল বিরোধিতা উপেক্ষা করে এদেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। আর্ট বা ইন্ডাস্ট্রি কোনো অর্থে কোনোরূপ শিল্পের মর্যাদা পাক বা না পাক এদেশের চলচ্চিত্রশিল্প ইতিহাসের দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছে। বর্তমানে বছরে গড়ে প্রায় ৪০টি ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র মুক্তিলাভ করছে। অথচ ১০/১২ বছর আগেও এ সংখ্যা ছিলো প্রায় ১০০। এসবের মধ্যে সফল ছবি ছিল, ছিল ব্যর্থ ছবি; ব্যর্থ ছবিই বেশি। এযাবৎ নির্মিত প্রায় তিন সহস্রাধিক ছবির মধ্যে উল্লেখ করার মতো ছবি হাতেগুনেই শেষ করা সম্ভব। বাকি সবই কোনো না কোনোভাবে সঙ্কটেরই অবলেশমাত্র। আর এজন্য চলচ্চিত্র ব্যবসায়ও সৃষ্টি হয়েছে সঙ্কট। এদেশের সহস্রাধিক প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে বর্তমানে তা প্রায় ৩০০-তে এসে ঠেকেছে।

maxresdefault

সাধারণভাবে চলচ্চিত্র শিল্পের যে সঙ্কট দৃশ্যমান তা হলো চলচ্চিত্র ও দর্শকের মধ্যকার দূরত্ব বা ব্যবধান। এই ব্যবধানকে সহজভাবে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বললেও ক্ষতি নেই। কেননা, চলচ্চিত্র বৈশিষ্ট্যগতভাবে ‘সংযোগ মাধ্যম’ হলেও চলচ্চিত্র ও দর্শকের মধ্যে কার্যকর সংযোগ ঘটছে না। ফলে, দর্শকের অভিযোগ ‘ভালো’ চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে না অন্যপক্ষে নির্মাতারা বলছেন দর্শক হলে এসে ছবি দেখছে না। বাস্তবসম্মত গল্প কাহিনির এবং আধুনিক প্রযুক্তির চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে না বলেই দর্শক আজ হলবিমুখ চলচ্চিত্রবিমুখ। বিগত কয়েক বছরের কিছু মানসম্মত গল্পের ছবিই তার প্রমাণ। ভাবতে অবাক লাগে উৎকর্ষতার এ সময়ে এসে বাংলাদেশে আজও ‘মার ছক্কা’ টাইপের ছবি নির্মাণ করা হয়। ‘এ ছবি চলবে’ এমন ভাবনা ও রুচির নির্মাতারা নিতান্তই দর্শকদের ঠকাচ্ছে। আর যারা ১.৩০-২ঘন্টার এসব দীর্ঘ ভিডিওকে চলচ্চিত্র বলে অনুমতি-অনুমোদন দিচ্ছে তারা সবথেকে বেশি অপরাধী| খুব স্বাভাবিকভাবেই চলচ্চিত্র পরিবারের সঙ্গে যুক্তরা সাধারণের কাছে তারকা খ্যাতিসম্পন্ন হন। তাদের একনজর দেখবার জন্য এবং তাদের কথা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকেন সবাই। চলচ্চিত্র তারকাদের অঙ্গভঙ্গি, কথাবার্তা, স্টাইল, ফ্যাশন এবং চালচলন অনুসরণ করাটাও সাধারণের রোজকার অভ্যাস। কিন্তু চলচ্চিত্রের সেই মানুষরা যদি হোন বিপথগামী? তাদের আচরণ যদি হয় পাড়াগাঁওয়ের স্বার্থপর যাচ্ছেতাই মোড়লদের মতো? তবে সেই মানুষদের সৃষ্ট যাচ্ছেতাই চলচ্চিত্র তো পথ হারাবেই।

image-75365

নন্দনতাত্ত্বিকদের মতে, শিল্প শিল্পীর অনুভবকে, অনুভূতিকে প্রকাশ করে। একজন শিল্পীর শিল্পসত্তা অনির্ভর, অসীম ও ক্ষয়হীন। শিল্পের গোড়ার কথাই হলো ‘রিয়েলিটি’ বা পরম সত্যকে প্রকাশ করা। আর মহত্তম শিল্প থেকেই তার কাঙ্ক্ষিত সত্য ও সুন্দরকে খুঁজে পায় শিল্পরসিক। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্র পরিবারে মহত্তম শিল্প বিনির্মাণ করতে পারেন এমন শিল্পী দুর্লভ|

আস্তাকুঁড়ে থেকেও মিরাকল ঘটার উদাহরণ পৃথিবীতে অনেক আছে। তেমনিই একটা মিরাকেল আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পে যদি হঠাৎ করেই ঘটা শুরু হতো! আমাদের এই শিল্প যেন বেঁচে থাকে মাথা উঁচু করে, স্বকীয়তা নিয়ে।

Advertisements