শাহাজাহান শামীম, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার। ‘বিসিটিআই’ এর ১ম ব্যাচের প্রথম স্থান অধিকারী এ কৃতী চলচ্চিত্রকার কাজ করে যাচ্ছেন চিত্রনাট্য নিয়ে যিনি মনে করেন চিত্রনাট্যে পরিবর্তনের ফলেই চলচ্চিত্রে উন্নয়ন সম্ভব। এই সংখ্যায় তিনি মুখোমুখি হয়েছেন ‘আই’-এর। কথা বলেছেন দেশের চিত্রনাট্যের উন্নয়নের উপায় ও তরুণদের চিত্রনাট্য লিখনে আসার ব্যাপারে। সাথে ছিলেন মোমেন খান, আশরাফ আবির, ইসমাইল চৌধুরী

আই: চিত্রনাট্য লেখায় কেন এলেন?

শাহাজাহান শামীম: একটা ভালোবাসা থেকে। গল্প বলার একটা নেশা থেকে। ছোটবেলা থেকে চলচ্চিত্রের প্রতি একটা অদম্য আকর্ষণ ছিল। সেই আকর্ষণই শেষ পর্যন্ত আমাকে চলচ্চিত্রে এনেছে।

আই: সিনেমায় কেন চিত্রনাট্য লাগবেই? চিত্রনাট্য ছাড়াও তো অনেকেই ফিল্ম বানিয়েছেন। পরিচালক একটা গল্প জানেন, ওটাকে তিনি মাথায় নিয়ে শুটিং করে গেলেই কি হয় না?

শাহাজাহান শামীম: যে পরিচালকের স্মরণশক্তি ভালো, তার চিত্রনাট্য নাও লাগতে পারে। বিশেষত-স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য ছাড়া কাজ করা সম্ভব। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, সিনেমা একটা যৌথ শিল্পমাধ্যম। টিমের সবার স্মরণশক্তি সমান নাও হতে পারে। অভিনয় শিল্পীর অভিনয়ের জন্য চিত্রনাট্য দরকার হয়। পরিচালক ছাড়াও আরও অনেকে কাজ করেন চলচ্চিত্রে -তাদের জন্য চিত্রনাট্য লাগে। যেমন: শিল্প নির্দেশক, পোশাক পরিকল্পক, সম্পাদক, শব্দ পরিকল্পক ইত্যাদি লোকজন চিত্রনাট্য ছাড়া কিভাবে কাজ করবে? সুতরাং চিত্রনাট্য লাগবে। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হলে অবশ্যই চিত্রনাট্য লাগবে।

আই: বাংলাদেশে চিত্রনাট্যকারের অভাব, জানা কথা। কিন্তু অভাবের গভীরতা মাপতে বললে কি বলবেন? কতটা অভাব আসলেই?

শাহাজাহান শামীম: আমাদের পরিবারিক পরিবেশ পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পী হওয়ার উপযুক্ত না। আমাদের অভিভাবকরা চায়, তাদের সন্তান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারী চাকুরে হোক। এর বাইরে তারা তাদের সন্তানকে অন্য কিছু করতে দিতে চান না। লেখক হওয়ার নেশা যার ভেতরে থাকে, তাকে প্রথম লড়াইটা করতে হয় তার পরিবারের সঙ্গে, তার অভিভাবকের সঙ্গে। তার অভিভাবককে বোঝাতে পারলে সে লেখক হতে পারে, নইলে পারে না। বেশির ভাগ মানুষ এই লড়াইয়ে হেরে যায়। অন্য কোন পেশায় চলে যায়। তার লেখক সত্ত্বার মৃত্যু হয়। পারিবারিক বিরোধিতার কারণে অনেক কম মেধাবী মানুষই আমাদের সৃজনশীল জগতে আসেন। চিত্রনাট্য লেখার জগতেও একই অবস্থা।

Shahajahan-Shamim-2 - Copy

আই: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে চিত্রনাট্যকার না থাকার কারণটা কী মূলত?

শাহাজাহান শামীম: বাংলাদেশের সিনেমার প্রযোজকরা গল্প নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি পরিচালকের উপর নির্ভরশীল এবং বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখেন পরিচালক নিজে। এ কারণে চিত্রনাট্যকারের চাহিদা কম। অন্য দেশে চিত্রনাট্যকারকে কাজটা দেন মূলত প্রযোজক। হলিউডে এ কাজের দেখভাল করার জন্য এজেন্সি পর্যন্ত আছে। তারা চিত্রনাট্যকারদের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করে প্রযোজনা সংস্থাকে দেয়। আমাদের দেশে এই রকম প্রযোজকও নেই, প্রযোজনা সংস্থাও নেই, এজেন্সি তো দূরের কথা।

আই: অভাবের সমাধান হিসেবে ‘কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া উচিত’ এর উপর তো ভরসা করা যায় না. আর উপায় কি?

শাহাজাহান শামীম: সমাধান হিসেবে গল্প বোঝেন এমন ব্যক্তিকে চলচ্চিত্র ব্যবসায় এসে প্রযোজক হতে হবে। অথবা যারা প্রযোজক হতে চান, তাদের গল্প নিয়ে নিজস্ব বোঝাপড়া থাকতে হবে। প্রযোজক গল্প বোঝার জন্য সব সময় পরিচালকের উপর নির্ভরশীল হলে আলাদা করে কখনও চিত্রনাট্যকার তৈরি হবে না।

আই: ধরুন, একজন তরুণ লেখক একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার গল্প লিখেছেন, চিত্রনাট্যও তৈরী করে ফেলেছেন। এখন এই চিত্রনাট্যটা তো কাউকে দেখাতে হবে। এই কাজটা কিভাবে করবেন তিনি? মানে পদ্ধতিটা কি?

শাহাজাহান শামীম: পদ্ধতিটা খুব সোজা। পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা। পরিচালক সময় না দিলে প্রযোজকের সঙ্গে যোগাযোগ করা। আমাদের দেশে হলিউডের মতো এজেন্সি নেই বলে নতুন চিত্রনাট্যকারদের নিজের চরকায় নিজেকেই তেল দিতে হয়। এর বাইরে আপাতত কিছু করার নাই।

Shahajahan-Shamim-2

আই: আপনার ‘গল্পের হাট’ নিয়ে কিছু বলুন।

শাহাজাহান শামীম: এক কথায় ‘গল্পের হাট’ চিত্রনাট্য লেখার একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠান। আমরা চিত্রনাট্য লিখে থাকি। এ ছাড়া আমরা যে কোন পরিচালক বা প্রযোজকের ফরমায়েশ অনুযায়ী চিত্রনাট্য লিখে দেই। আমাদের এই চিত্রনাট্য লেখার কাজটি কোন একক লেখক করেন না, বরং একদল লেখক মিলে একটি চিত্রনাট্য লিখে থাকেন।

আই: চিটাগং শর্ট স্ক্রিপ্ট রাইটিং ফেস্টিভাল আয়োজন করেছে- আপনি যার যৌথ পরিকল্পক এবং প্রধান রিসোর্স। আপনিতো খুব কাছ থেকে সবকিছু দেখেছেন। এই আয়োজনকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

শাহাজাহান শামীম: চিটাগং শর্ট স্ক্রিপ্ট রাইটিং ফেস্টিভ্যাল একটি দারুণ উদ্যোগ। কিন্তু আমি নিজে অনেকগুলো সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় যথেষ্ঠ সময় দিতে পারছি না। আশা করি, জানুয়ারি মাসের মধ্যে আমার ব্যস্ততা কমে আসবে এবং আমি আবারও সময় দিতে পারব। এই আয়োজনকে আমাদের এগিয়ে নিতে হবে আমাদের নিজেদের স্বার্থে। আমাদের সিনেমা শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার জন্য মেধাবী ও দক্ষ চিত্রনাট্যকার তৈরি করতে হবে। আশা করি, আমাদের এই আয়োজন সেই লক্ষ্য পূরণ করবে।

আই: তরুণ লেখকদের উদ্দেশ্যে আপনার কিছু কথা শুনতে চাই।

শাহাজাহান শামীম: হতাশ হবেন না কোন অবস্থাতেই। লেখালেখির জগতে সহজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায় না। লড়াইটা সারা জীবন ধরে চালাতে হয়। সেই লড়াইয়ে হার জিত দুটোই থাকবে কিন্তু কাজ থেমে থাকবে না।

আই : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

শাহাজাহান শামীম : আপনাদেরও অনেক শুভকামনা!

 

*আই – জানুয়ারি ২০১৭ সংখ্যায় প্রতাশিত

Advertisements