শাহরিয়ার নাফিস, অভিনেতা ও চলচ্চিত্র সমালোচক

মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীর চলচ্চিত্র মানেই আলোচনা, সমালোচনা।নিজের নির্মানগুণ কিংবা গল্প বলার ধরন, তা অন্যদের চাইতে আলাদা বলেই মানুষ প্রতীক্ষায় থাকে, সারাক্ষণ আপডেটেড থাকে কখন তিনি কোন কাজে হাত দিলেন। এ যাবৎ যে কয়টা সিনেমা বানিয়েছেন তার মধ্যে মুক্তির আগেই আলোচনার টেবিল গরম করেছে এমন সিনেমা তার একটাই। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে সিনেমার আগে সিনেমা নিয়ে তুমুল আলোচনা, যা কিনা শুধু সিনেমা পাড়াতে না থেকে গোটা বাংলাদেশের সব ধরনের মহলে পৌছেছে এমন সিনেমা এই “ডুব” ছাড়া আর কোনো সিনেমা নিয়ে হয়েছে কিনা তা অনুসন্ধান এর দাবী রাখে। মুক্তির আগেই সিনেমাটা বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক “হুমায়ুন আহমেদ” এর জীবনী নিয়ে করা হয়েছে কি হয় নাই তা নিয়েই যত জল ঘোলা! সিনেমার প্রকাশের পর তা রিভিউ থেকেই আশা করি বের হবে আসলে “ডুব” কি ছিলো!

“ডুব” সারওয়ার ফারুকীর সিনেমা। প্রথম প্রশ্ন সিনেমাটার নাম “ডুব” কেনো? ইংরেজীতে সিনেমার নামকরণ করা হয়েছে “No Bed Of Roses”, যার অর্থ দাঁড়ায় “কোনো পুষ্প শয্যা নহে “। খুব প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে ইংরেজিতে “Life is not a bed of Roses”। তো এই সিনেমাতে যে গল্প বলা হয়েছে বা বলার চেষ্টা করা হয়েছে তা কি জীবন সম্বন্ধীয়? যে জীবন সব কয়টা সাধারন জীবনের মতই অমসৃণ? আচ্ছা “ডুব” দিলে একজন মানুষ কি মরে যায়? নাহ মরে নাহ, কিন্তু সে বেঁচে থাকাটা স্বাভাবিক নাহ, সে বেঁচে থাকাটা বাঁচার চেষ্টায় থাকা। সে বেঁচে থাকাটা স্বাচ্ছন্দের নাহ। মানুষ জীবনে “ডুবে” গেলে বাঁচার চেষ্টায় যতটুকু বাঁচে তা মোটেই “A Bed Of Roses” নাহ। তো জনাব সারওয়ার ফারুকীর এই সিনেমাতে এমন কোনো বাঁচার গল্প আছে? আসুন ভেতরে ঢুকি।

গল্পের শুরুতেই জাভেদ হাসান তার মেয়ে সাবেরিকে বলছিলো মৃত্যুর আগে তার বাবা কি বলেছিলো তাকে। তার বাবা বলেছিলো “মানুষ মারা যায় তখন ই যখন সে তার সম্পর্কের মানুষগুলোর সাথে প্রয়োজন হারায়”। গল্পে জাভেদ হাসান এর যে মৃত্যু দেখানো হয়েছে, তা কি প্রয়োজন হারানোর পরেই না? অবশ্যই জাভেদ হাসান মারা যান তার সম্পর্কের মানুষগুলোর কাছ থেকে অপ্রয়োজনীয় হবার পর। যে জীবন থেকে আস্তে আস্তে কাছের মানুষগুলো হারিয়ে যেতে থাকে, সেই জীবন ই তো কণ্টকময়, সেই জীবনকে পুষ্পশয্যার সাথে তুলনা করা যায় না। সেই জীবনই “ডুব” দেয়া জীবন। মানুষ জীবন থেকে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন নিজের কৃতকর্মেই। এবং সারাটাজীবন ভর প্রচেষ্টা থেকে প্রয়োজনীয়তায় ফিরে আসবার। গল্পে জাভেদ সাহেব কি তা করেন নি? খুব করেছেন ফিরে আসার। জীবনে ফিরে আসার প্রচেষ্টায় হার মেনে তিনি “ডুব” দিয়েছেন “নীতুর” মায়ায়। এই “ডুবে” বাঁচার প্রচেষ্টা করেছেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি। মানুষ তার জীবদ্দশায় বাঁচে সম্পর্কে, মৃত্যুর পর কেবল বেঁচে থাকে তার কর্ম। এই কথাটা এই সিনেমাতে খুব ভালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কর্মের মুল্যায়নের মাঝে আমরা মাঝে মাঝে ব্যাক্তির জীবনকে হারিয়ে ফেলি। হারিয়ে ফেলি জীবনের সম্পর্কগুলোকে। জাভেদ হাসান একজন সফল কর্মবীর নি:সংগ মানুষ ছিলেন।

71C1860C-4CED-4C1C-ABD6-22FDE8BA1CD1

পুরো সিনেমার গল্প জুড়ে কোনো কিছু বুঝিয়ে দেবার তাড়না দেখি নাই। একটা জীবনের সংকট দেখানো হয়েছে, বিয়োগাত্মক পরিণতি দেখানো হয়েছে এবং বুঝে নেবার দায়ভার ছেড়ে দেয়া হয়েছে সম্পূর্ণ দর্শকের হাতে। যে যেভাবে নেয় তার জন্য গল্পটা তেমন-ই। প্রচুর সংলাপ নেই, বলতে সংলাপের স্বল্পতা প্রচুর। সংলাপ ছাড়া যদি বুঝিয়ে দেয়া যায় তবে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? আর জীবনের সব অনুভূতি কি প্রকাশের ভাষায় প্রকাশ করা যায়? অনেক অনুভূতিই কি বোবা না? জাভেদ হাসান যখন তার আগের সংসার ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন সাবেরি (তার মেয়ে) যে তাকে পানি খাওয়াতে আসছিলো তখন মেয়ে হিসেবে সাবেরির কি সংলাপ থাকতে পারে? “বাবা তুমি যেয়ো না, তুমি চলে গেলে আমাদের কি হবে” এমন? আচ্ছা তখন জাভেদ হাসানের কি বলার ছিলো? “মা ভালো থাকিস, ভালো করে পড়াশুনা করিস” এমন? আমি কোনো সংলাপ খুঁজে পাই না।

এবার আসি বিতর্কের তর্কে। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালক, গল্প লেখক যার আগের বিয়ে ভেঙ্গে গিয়ে পরে নিজের মেয়ের বান্ধবীর সাথে বিয়ে হয়, বলুন তো এমন কোনো ব্যাক্তির নাম? বাংলাদেশী শুধু না, বিশ্বের যেকোন মানুষ খুব সহজেই এমন প্রশ্নের একটা সাধারণ উত্তর করবেন। জ্বী, হুমায়ুন আহমেদের কথাই বলছি। উনার জীবনী ছাড়া আর কারো জীবনে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে আমাদের জানা নাই। আচ্ছা হতে পারে না ব্যাপারটা শুধুই আমাদের জানার স্বল্পতা? আচ্ছা এইটা তো জীবনের ঘটনা, তা অন্যকারো সাথেই কি মিলে যেতে পারে না? আচ্ছা আপনি হুমায়ুন আহমেদকে কতটুকু জানেন? উনার গল্পগুলো দিয়েই কি উনাকে জানেন না? কিংবা উনার ব্যাপারে যা জানেন তাও কি শুধুই পড়ে নয়? এমনকি স্বয়ং পরিচালকও হুমায়ুন আহমেদ এর সাথে তার জীবনে দেখা করেন নাই। হুমায়ুনপত্নী শাওনও বলেছেন যেভাবে সিনেমাতে দেখানো হয়েছে তাতে করে হুমায়ুন কে ভুল বুঝবে পাঠক। তো পরিচালক কাউকে না জেনে কিভাবে তাকেই তুলে ধরেন সিনেমাতে? নাহ্, তিনি তুলে ধরেন নাই। সিনেমাতে জীবনের মাঝে “ডুবে” মারা যাওয়া জাভেদ হাসানকে দেখেছি, হুমায়ুন এর জীবন দেখি নাই। এমনকি পরিচালককে কাউকে দোষী করে দেখাবার প্রবণতাও দেখি নাই। দেখেছি কিছু চরিত্রের চারিত্রিক প্রবণতা যাকে আপনি অনেকভাবেই সংজ্ঞায়িত করতে পারেন।

পুরো সিনেমাতে সিনেমাটোগ্রাফি ছিলো দারুণ। ক্যামেরার কাজ বা ক্যামেরা ধরার ব্যাপারটা চিরচরিত সারওয়ার ফারুকী স্টাইলেই ছিলো। হলের দূরবস্থায় শব্দের অবস্থা ছিলো খারাপ বরাবরের মতই। চট্টগ্রামে সিনেপ্লেক্স অনেক আগে থেকেই তাই সময়ের দাবী। আলমাসে এমন সিনেমা চালানো উচিৎ না।

সর্বশেষ ব্যাপার হলো, “ডুব” সিনেমা হলে গিয়ে হজম করবার মত নাহ। সাইকোলজির ক্লাসে আপনি এই সিনেমা দেখায়ে ছাত্রদের টাস্ক দিতে পারেন তাদের বোধগম্যতা কতটুকু তা যাচাই করতে। কিংবা সাহিত্যের ছাত্রদের দিতে পারেন লিটারেচার রিভিউ লিখতে। আসলেই বাণিজ্যিক সিনেমা না এইটা, জুরি বোর্ডের বিচারে জীবনের গল্প বলার জন্য “পুরস্কার” জিতে নেবার মত সিনেমা। বাংলাদেশেও এমন সিনেমা হচ্ছে, হয়— ভাবনাটা মন্দ না কিন্তু! বাংলা সিনেমার জয় হউক।

Advertisements